সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা ও আদর্শিক রাজনীতি: ১৯৫০ থেকে ২০২৫-এর প্রেক্ষাপটে ড. মির্জা গালিবের বিশ্লেষণ
প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত সংবাদপত্রের ভূমিকা সবসময়ই ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। ১৯৫০-এর দশকে সংবাদমাধ্যমগুলো ছিল শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা এবং আদর্শিক অবস্থান নিয়ে জনমনে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম শীর্ষ দৈনিক 'প্রথম আলো'-র সম্পাদকীয় নীতি নিয়ে সম্প্রতি কঠোর সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মির্জা গালিব।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় 'দৈনিক আজাদ' বা 'ইত্তেফাক'-এর মতো পত্রিকাগুলো বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রত করেছিল। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকদের আত্মত্যাগ ছিল অপরিসীম। তবে স্বাধীনতার পর থেকে সংবাদপত্রগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক মেরুকরণে বিভক্ত হতে শুরু করে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মুক্ত সাংবাদিকতার এক নতুন যুগ শুরু হলেও গত দেড় দশকে 'সেকুলার বনাম ধর্মীয়' মতাদর্শের লড়াই সংবাদপত্রের পাতায় প্রকট হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ২০২৫ সালে এসে এখন গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ চলছে।
মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে ড. মির্জা গালিব দাবি করেন, প্রথম আলো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার চেয়ে মতাদর্শিক রাজনীতিতে বেশি সক্রিয়। তার মতে, পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে এমন এক সম্পাদকীয় রাজনীতি করছে যা কার্যত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানকে বৈধতা দেয়। ড. গালিব উল্লেখ করেন, বাংলাদেশকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বা ‘ইসলামী মৌলবাদের ঝুঁকি’ দেখিয়ে যে ইসলামোফোবিক সেকুলারিজম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি আওয়ামী লীগ করে, প্রথম আলোর অবস্থানও প্রায় একই।
ড. গালিব তার পোস্টে ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে দেখান যে, জামায়াত বা হেফাজত সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রথম আলো অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষা (যেমন: তাণ্ডব, ধ্বংসযজ্ঞ, বর্বরতা) ব্যবহার করে। অথচ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনায় তারা সচেতনভাবে সরাসরি দায় এড়িয়ে 'বাসে আগুন' বা 'হামলা হয়েছে'—এরকম নমনীয় ভাষা ব্যবহার করে। তিনি মনে করেন, এটি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘আমরা বনাম তারা’ রাজনীতিকে উসকে দেয়।
অধ্যাপক গালিব আরও অভিযোগ করেন, প্রথম আলোর অফিসে হামলা হলে সেটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু নয়াদিগন্ত, সংগ্রাম বা আমার দেশ পত্রিকার ক্ষেত্রে একই প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। এই 'সিলেক্টিভ মোরালিটি' বা খণ্ডিত নৈতিকতা সাংবাদিকতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
১৯৫০ সাল থেকে চলে আসা এই ভূখণ্ডের মানুষের লড়াই ছিল সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা। ২০২৫ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ড. মির্জা গালিব বলেন, বাংলাদেশে সেকুলার ও ধার্মিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও দেশটি সবার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথম আলোর সমালোচনা থাকলেও তাদের মতপ্রকাশের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তবে গণমাধ্যমকে সিলেক্টিভ প্রতিবাদ থেকে বেরিয়ে এসে সব পক্ষের ওপর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
বিশ্লেষণ: ১৯৫০ থেকে ২০২৫ সালের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গণমাধ্যম যখনই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় বা আদর্শিক পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তখনই সাংবাদিকতা তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়। ড. মির্জা গালিবের এই পর্যবেক্ষণ ২০২৫ সালের নতুন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—যেখানে ভিন্নমত থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।
সূত্র: ১. ড. মির্জা গালিবের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল (২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫)। ২. দৈনিক যুগান্তর (জাতীয় রাজনীতি ও গণমাধ্যম বিভাগ)। ৩. বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিবর্তন আর্কাইভ।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |